কাব্য উপন্যাস

নাজমীন মর্তুজা

চোরকাঁটা

আমায় কত নামেই না ডাকত, তার মধ্যে একটি নাম আমার ভীষণ প্রিয় ছিল…। যখন সে বলত আমায় চন্দ্রাবতী…।

আহা…! আমি যেন তখন দোভাষী, পুঁথির পয়ারে পয়ারে, সাজাতাম লাইনের পর লাইন, আমার প্রণয় নাম—চন্দ্রা…। আমিও মাঝেমধ্যে তাকে আদুরে গলায় ডাকতাম, আমার মাগন।

হেসে বলত, ঠিক আমিই মাগন, চন্দ্রাবতীর প্রণেতা কোরেশি মাগন ঠাকুর।

সে ছিল আমার ছোটকালের আগলভাঙা পাগল প্রেমিক, স্কুলে যেতাম দুজনে বেশ শক্ত করে হাত ধরাধরি করে, একই ছন্দে একই তালে পা ফেলে ফেলে।

ছোটবেলায় তেমন কথা হতো না, লম্বায় সমান ছিলাম দুজনে। ওর মা শক্ত করে বলত হাত ধরাধরি করে যাবে, আর দেখে যাবে রাস্তার পাগলা কুকুরগুলোকে।

যেই না সামনে কোনো কুকুর দেখত…তখনই শক্ত করে আমার হাত দুটি চেপে ধরত। ওমা! ইশ বললে বলত, তোমাকে কুকুর কামড়ে দিলে? আমি কার সঙ্গে খেলব, শুনি। বর-বউ, সাপলুডু, কুমির তোর জলে নেমেছি।

একদিন স্কুলের মাঠে চোরকাঁটা বাছার দিন, স্কুলমাঠ পরিষ্কার করতে সব ছাত্রছাত্রী মাঠে নেমেছে। সে পড়ত আমার দুই ক্লাস এগিয়ে। আমি ঘেমে একসার হয়ে চোরকাঁটা গাছ তুলছি; কোথা থেকে যেন বাজপাখির মতো দৌড়ে এসে আমার হাতে মুঠোভর্তি চোরকাঁটার গাছ দিয়ে বলল, প্রিটেন্ড করো তুমি গাছ তুলছ, সব্বাই তুলছে তো…। তোমার তুলতে হবে না, তুমি দাঁড়িয়ে থাকো।

বলেই আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, এই পাগলি, ব্যথা পাচ্ছ না? তোমার মোজা ভর্তি চোরকাঁটা?

হয়তো ফুটছিল আমি বুঝিনি। তার বলাতে কেমন যেন কাঁটার মতো ফুটতে শুরু করল।

ই-মা! কী করে। এ মোজা থেকে চোরকাঁটা ছাড়াব বলতেই সে আমার পা তুলে তার হাঁটুতে রেখে দুই হাতে তুলতে লাগল বেশুমার।

পেছন থেকে পিটি স্যার এসে তার কানটা ধরে তুলল। এই যে মজুন সাহেব, মোজা থেকে না মাঠ থেকে চোরকাঁটা তোলেন…।

কান ধরে টানতে টানতে ওর ক্লাসের লাইনে দাঁড় করিয়ে এল।

আমি যেন বিশাল সূর্যটাকে মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম স্কুলমাঠের কেন্দ্রে: সোনালি আগুন চেপে জলের শরীরে।

সে রাতে তার জ্বর ছিল। আমি জানতাম না, তার দহন দহেনি আমাকে, সে আমার লেখা কাব্যের চরিত্র নয়, নামদার তখনো কেউ। একটা রুপার বালি পরানো অদ্ভুত অবাক হয়ে তাকিয়ে ভাবছি, একটা পুরুষ শরীর ব্যক্ত বহুদলে, তবু গর্ত যেন কানের মাঝখানে?

জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলেও করিনি আধো লাজে আধো মহব্বতে। আমার হাতটা মুঠোয় চেপে ধরতেই চমকে উঠলাম, হায় কী গরম! যেন তাতানো কড়াই। ওহ! এত গরম কেন?

সে হেসে বলল জ্বর গায়ে দেখতে এসেছি তোমাকে, তুমি তো আসবে না—দাঁড়াও তোমার জন্য চকলেট আছে। বড় মামা কলকাতা থেকে এনেছে, কী স্বাদ! দুধু মালাই, খাও খাও না, একসঙ্গে দু-দুটি চাকতির মতো চকলেট মুখে গুঁজে দিল।

সে আমার ভ্রমর! রাখি সোনার কৌটায়—অন্তরের গূঢ় সরোবরে, বাক্সে হাজার পরতে, লুকিয়ে শৈশবের গল্পের অন্তরে। সে গল্প ফুরাবার নয়। সে আমাকে প্রেমী বানিয়ে ছেড়েছে, আমি ঘরে থেকেও ঘর সন্ন্যাসী, নিজে কেটে নিজের স্নায়ু সাজাই জীবনগল্পের তশতরি।

একটা ব্যথা কিসের খুনের, ব্যথা—এ ব্যথা কার আঘাতের ছুরি, কেন হানে সকলে অহর্নিশি। সে গল্প কেন ফুরায় না আহা! এ বয়সেও আছাড়ি পাছাড়ি, নিজে নিজেই কাঁদে কেন প্রাণগলা ধরাধরি করি।

পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেছে সে, স্কলারশিপ পেয়েছে ট্যালেন্টপুলে, সেদিন পুকুরঘাটে বসে, পানিতে পা ডুবিয়ে পানির ঘনত্ব মাপার খেলায় মশগুল, কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সে, বুঝিনি সেদিন, সে প্রথম অন্য নামে ডাকল যে…!

এই ফড়িং কী কর…? হেসে বললাম আমি ফড়িং? হুম ফড়িং-ই তো! কত উড়তে পার বাবা! তোমার পেছনে ছুটতে ছুটতে আমি ক্লান্ত—হাসছি দুজনে, হাসি-হাসি-হাসি, আহা সেই হাসি…। যেন সমস্ত নিখিলের বাগ্‌যন্ত্র থেকে শিশিরের মন্ত্র ঝরছে।

তার হাসি ছিল আমার কাছে সদানন্দের ভোর, আমার নচিকেতা। তার কণ্ঠ ছিল মিনারে মোয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি…দূর থেকে খুশবু বয়ে আনত। তখনো প্রেমপত্র লিখিনি আমরা, চোখের পাতা পড়ি, ঠোঁটের কাঁপন পড়ি, হাতের মুঠোয় হাতের শক্ত করে চেপে ধরা অবস্থা বুঝি, হাঁটতে হাঁটতে বুঝি ‘এ পথ যদি না শেষ হয়’ এই গানের মর্ম।

আমার কোলে মাথা রাখা হয়নি ওর কিংবা চাঁদের সঙ্গে বাক্‌ বিনিময় বাঁশ বাগানের বনে।

আমরা জানতাম আমাদের সমাজে কেউ কারও ছবি দেয়ালে টাঙাতে পারব না। কিংবা বইয়ের ভাঁজে রাখতে, তাই থিমেটিক ওয়েতে সেখানে রাজেশ খান্না, টিনা মুনিম, অমিতাভ-রেখা, উত্তম-সুচিত্রার ভিউ কার্ড থাকত। পেছনে লেখা থাকত সংকেত—অ + ই…।

আজ ও নেই পাশে তথাপি মুক্ত চাঁদ উঠছে একা। তার নামেই হঠাৎ আমার পদ্যটি লেখা। সে সময়ে আমাদের গ্রামে সাক্ষী একা চাঁদ, সন্ধ্যাবেলার চড়ুইভাতি, লবণ, রসুন, মরিচ ঝাল।

সময়সূত্রে সেই গ্রামটার কাছে আমরা দুজনই ঋণী। তখনো সেখানে মার্ক্স-লেনিন আস্তানা গাড়তে পারেনি। চিঠি লেখা শুরু হলো। প্রথম প্রথম শুধু বানান ঘাঁটাঘাঁটি, আমার চিঠিতে ১০০ শব্দে, ৫০ শব্দই বানান ভুল থাকত। এ নিয়ে তার কত্ত মাতব্বরি, এটা নয় সেটা, ফিরতি চিঠি আসত প্রুফ দেখা। পেছনে লিখত এরপর এই শব্দগুলো লিখতে ভুল করবে না ‘জাদু’।

জাদু, আহা! কী গভীর এক মায়া আমার সমস্ত আবেগের পালক খসে পড়ত সুখ নিনাদে। তারপর ইচ্ছে করেই ছোট চিঠি লিখতাম। কশি টানা খাতার মাঝবরাবর একবার প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলাম, আচ্ছা বল তো আমি কী সমুদ্র নাকি মাটি?

এর উত্তরে সে ১০ পাতার চিঠি লেখা প্যাড ‘ভুলো না আমায়’ প্যাড পুরো খতম করে আস্ত খাতা এনে ধরিয়ে দিত। মুশকিল হতো তখনই, কোথায় রাখি লুকিয়ে এমন আস্ত একটা প্রেম, স্নেহ এবং প্রীতি। ছোট চিঠিগুলো আমি হাফপ্যান্টের কোমরের রাবারে পকেট বানিয়ে গুঁজে রাখতাম। কতবার পড়তাম টয়লেটে বসে, কখনো বাথরুমে, কখনো কম্বলের নিচে। ঘরের পেছনে গিয়ে, যেখানে সচরাচর মানুষ যায় কম।

এরপর গুছিয়ে নিভিয়া ক্লোল্ড ক্রিমের কৌটায়, কোথাও ফেলতাম না। সব সময় ব্যাগে নয়তো হাতের মুঠোয়। ফাল্গুন মাসে আমার খুব ঠোঁট ফাটত, কিছুতেই হাসতাম না, একদিন দাঁড়িয়াবান্ধা খেলতে গিয়ে এমন করে এক মেয়ে পায়ে পাড়া দিল, ওমা বলে যেই না কান্না! অমনি শুষ্ক ঠোঁট ফেটে রক্ত। কোথা থেকে বাজপাখির মতো দৌড়ে এসে পকেট থেকে শিশু মালতী বের করে নিজেই আমার মুখে–ঠোঁটে লাগিয়ে দিতে দিতে বলছে, ইশ্‌, এমনি করে হা করে কাঁদে কেউ? কতটা ফেটে গেল, থাক আর খেলতে হবে না, ভুটকি, দৌড়াতে পারে না খেলছে দাঁড়িয়াবান্ধা!

এরপর কোনো দিন খেলিনি, কিন্তু শিশু মালতী হলো আমার প্রিয় একটা গন্ধের নাম। সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। সকাল সকাল রেঞ্জার সাইকেল নিয়ে হাজির। বের হতেই বলল কী সুন্দর নাহ? হাসলাম।

বলল, নানু দিয়েছে; নীল সাইকেল, চল তোমাকে নিয়ে বড় রাস্তায় ঘুরে আসি। কিছু না ভেবে দৌড়ে গিয়ে উঠলাম। ভুলেই গেছি বেমালুম আমার প্রথম পিরিয়ড হয়েছিল সেদিন। তখনো অভ্যস্ত নই ন্যাপকিন ব্যবহারে, দুই পা চেপে কেমন করে যেন ন্যাপকিন চেপে চেপে রোবটিক হাঁটা হাঁটতাম।

যেই না সাইকেলে লাফিয়ে উঠতে গিয়েছি, অমনি রক্ত ঝরতে শুরু করল। পায়ে রক্তের রেখা দেখে চেঁচিয়ে বললাম এই থামাও, আমার রক্ত বের হচ্ছে। সে অমনি সাইকেল থামিয়ে, আমার পায়ে রক্তের রেখা দেখে অস্থির হয়ে ব্যতিব্যস্ত, কোথায় কাটল, ইশ্‌, কী করে? কোথায় দেখাও, খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝি।

আমি বলব বলব করছি, এরই মধ্যে হাঁটুতে জমে থাকা রক্তে মুখ গুঁজে চুষতে লেগে গেছে!

চিৎকার করছি এই খেয়ো না, এটা বাজে রক্ত, ততক্ষণে মুখে তুলে বলছে, তোমার রক্ত কী করে নষ্ট হতে দিই, আমার ভেতরে রাখছি।

তার মাথার চুলগুলো ধরে তুললাম, তারপর রাস্তার মধ্যে ভুলে গেলাম কে আছে কোথায়। তাকে পাগলের মতো চুমু দিতে লাগলাম—নিজেকে ছাড়িয়ে বলল, এই পাগল মানুষ দেখলে; সেদিন তার মুখখানা বড় মায়াবী হয়ে উঠেছিল, তার ঠোঁটগুলো যেন আরও পবিত্র।

বললাম, তুমি কি খেলে জানো? আমার পিরিয়ডের রক্ত গাধা!

সে হাসছে, বলছ তো? তোমারই তো সব।

এরপর রাস্তায় বসে দীর্ঘতম চুমুর ভেতর যেন যত জল জমে ছিল, তত জল জমে হলো সরোবর।

এসএসসি শেষ করল, সে কী ভালো রেজাল্ট! আমাকে বলল, এবার আমাদের দুজনের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়। তোমার জন্য তোমার হৃৎপিণ্ড কিছু হতে যাবে—আমি কী হব তুমি কেমন রূপে দেখবে আমায়?

আমি শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে, পুলের নিচের নরম মাটি পায়ের আঙুলে খুঁটছি। আমি আমার সুন্দরের পাশে আর এমনি করে দাঁড়াতে পারব না। সময়, সমাজ, সংসার এমন কেন? আক্রোশে হুংকারে চিৎকারে—নিজের আবেগের সঙ্গে প্রতিবাদ করি। কী করে পরস্পর পরস্পরে ফারাক করি। যাও…।

একটি শব্দে থেমে থেকে, কী যেন ভাবছি, আমার হাতটা মুঠোর ভেতরে চেপে অঝোরে কান্না। বলছে জাদুরে তোকে হারিয়ে ফেলব বুঝি। কেন এমন—তোমাকে ছাড়া আমি তেজি ঘোড়া নই…আমাকে ক্ষমা করবে তো জাদু, যদি ঠিকমতো খোঁজ না নিতে পারি, যদি অবহেলা করি।

আমি তখন বোবা কান্নায় বিমূর্ত ক্যানভাসে, ধূসর রঙের ছবি আঁকছি। কোথায় আমার স্বরযন্ত্র কোথায় জিহ্বা, কোথায় অক্ষর বর্ণমালা, লড়াকু শব্দগুলো, নখ বড় আঙুলগুলো, সব কেমন নেতিয়ে যাওয়ার পথে, একটি বুকে কী করে থাকে দুটি অন্তর। অন্তর ছাড়া কী বলা যায়!

কোথায় পাব তবে, মনোনিবেশিত যত্ন, সেদিন দুজনে নীরবতায়, লিখে গেলাম অন্তরে অন্তরে, হাজার অনুস্মৃতি। ফিরলাম বাড়ি, বুকে নিয়ে ছোট নদী, কাশবন পরিত্যক্ত চিঠি।

পরদিন স্কুল যাওয়ার পথে, হাতে ধরিয়ে দিল তার প্রিয় ওয়াকম্যান, কিছু ক্যাসেট, আমার মান্না তার মান্নাদের গান। দিল শিশু মালতী। বাংলা ডিকশনারি, একটা ডায়েরি।

আমি তখন রাস্তায় স্কুলব্যাগ নিয়ে সহায়–সম্বলহীন। দিলাম খুলে মাথার ববি ক্লিপ, হাতের ফ্রেন্ডশিপ বেল্ট, এক গোছা চুল—পায়ে মোজা, আঙুলের ভাঙা নখ। শিশু মালতীর চুমু তার স্যান্ডো গেঞ্জিতে।

বললাম বড় হও, যদি সুতো কাটা ঘুড়ি হই, তবে আকাশকে কোরো না দায়ী, আমার হারিয়ে যাওয়ার জন্য।

সে চুপ…, স্মৃতি ও বিস্মৃতির মধ্যবর্তী শয্যায়, তাকে মনে হয় শান্ত পুকুর, অধিক জল বুকে নিয়ে সমাহিত কচুরিপানার মতো।

তারপর! আমার সকল দিনের মধ্যে গ্রাম, সকল দিনের মধ্যে বিরহ, সে আমার কাছ থেকে লাখ লাখ দিন দূরে, আমার সকল দিনের মধ্যে বিস্মৃতি, সকল দিনেই কোলাহল আর ব্যস্ততা। তারও তখন বিকেল অবসর, সোডিয়াম বাতি সন্ধ্যাকালীন টিউশন, তত দিনে তাকে আমি পরান নামে ডাকি। চিঠি লিখে পোস্ট করেছি এরই মধ্যে।

নটর ডেমে পড়ে, মস্ত কলেজ। অপেক্ষা করি দিনের পর দিন, একদিন বিকেলে পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে বসে গল্প করছি, তার এক বন্ধু এসে হাতে একটা খাম ধরিয়ে বলল, বোমা আছে সাবধানে খুলো।

আমার মন তখন ভাষা ভারাতুর, নগ্ন খামের ভেতরের স্বাদ বাক্যে পেতে চাই। যা কিছু সংবাদ রূপ রসে স্পর্শে গন্ধে। তার যত্ন, তার ডাক, তার ভিজিয়ে দেওয়ার সুখ প্রত্যেক আবেগে পেতে চাই পাগলের মতো। কিছুক্ষণ নাকে শুঁকে গন্ধ নিতে থাকি, মনে হয় কত চেনা, প্রথমেই চমকে যাই—চন্দ্রাবতী আমার!

এ কে? পরের লাইনে দেখি, তোমার একটা নতুন নাম দিলাম—‘চন্দ্রাবতী’, পছন্দ না হলেও রেখে দিয়ো অন্তরে—তুমিও তো পরান রেখেছ, পরান, আহা! যেন পুরো অস্তিত্বে বসত আমার। চন্দ্রা আমার জাদু। এ শহরে প্রাণ নেই, আমি প্রাণহারা হয়ে ঘুরি অলিতে–গলিতে, মাঝেমধ্যে মোড়ের কুকুরটা মাঝরাতে করুণ সুরে ডাকে; মনে হয় তুমি বলছ ডাকতে পরান পরান নামে, আমার ডাকনাম ধরে ডাক দেয়।

মাঝেমধ্যে নিজেকে ঝাঁকিয়ে দেখি, বস্তুসর্বস্ব নই তো আমি, আমার চন্দ্রা, সাড়ে আট বছর বয়সে সারা গায়ে মাটির গন্ধভর্তি যে বালিকার হাত ধরে আমার বাল্যকালকে ভরে তুলেছি অবচেতন সৌগন্ধে, তুমি কী সেই চাষির মেয়ে? তুমি কী কুয়োর জল, আমি বালতির মতো আছড়ে পড়ি, চন্দ্রা আমার হাঁটতে শেখা, তুমি কী আমার শিকড় ও শস্যের সঙ্গে আমার বাল্যকালের বিবাহ?

আমার সকল উচ্চারণ অনুধ্যানের মধ্যে যে থাকে, সে তুমি, আমার চন্দ্রা আমার জাদু, আমার অতীত, বর্তমান এবং আগামী। আমি শিগগিরই আসছি তোমার কাছে, এই তো মাত্র ১৫টি দিন। চোখে রাখি তোমায় নীলাঞ্জন ছায়া আমার, আমার চোখের অঝোর বর্ষণ। তুমি লিখো শিগগিরই।—তোমার পরান।

লিখতে বসলাম তখনই হন্তদন্ত হয়ে, যেন আবেগ উছলে যাওয়া শব্দে লিখে ফেলব আজ, যা আছে জমা কথার ওপর কথা। পরান, অতর্কিতে পেয়ে যাব আদি আষাঢ়, তাও গদ্যে পদ্যে ভরপুর মোশন পিকচারে ভাবিনি, চন্দ্রাবতী বড় সুন্দর, শুনেছি সে মহাবতী আমি তো নই। তবু তুমি আমার নাম প্রণেতা, তবে কী তোমায় মাগন ঠাকুর ডাকব, কোরেশি মাগন ঠাকুর।

পথ চেয়ে থাকলাম, অন্তর বিছিয়ে ফেরি পারাপারে, যমুনার জলে দেখতে কেমন টলমল করে হাসছি চাঁদের সঙ্গে স্মৃতি আঁকি স্মৃতি বুনি, যেন এক নাহরের গল্প, মাথায় করে ফিরছে পরান, বারান্দার কোণে বসে শুধু তারই মঙ্গল কামনা করি।

যেদিন আসার কথা, তার দুই দিন আগে সে রওনা হয়েছিল, হয়তো সারপ্রাইজ দেবে বলে। ওর বন্ধু দুলাল আসে, রাত তখন তিনটে হবে, সে কী আওয়াজ গেটে, চিৎকার করে ডাকছে, বের হতেই জড়িয়ে ধরে—গরগর করে বলছে পরান নেই, হানিফ অ্যাকসিডেন্ট করেছে।

না, ও তো ২২ শ্রাবণ আসবে।

না, আজ এসেছে লাশ হয়ে। তুই যাবি চল।

সে দিনও আমার পিরিয়ড চলছে, দৌড়াচ্ছি রক্ত মাংস ফেলে হেরো মন নিয়ে, এ কথা মিথ্যে হোক, এ কথা মিথ্যে হোক। খণ্ড বিশ্বাস ছিল, পথে কাদা ছিল, বনে পায়ে হাঁটা পথ, ঋতুস্রাবের রক্ত এসে জমাট বেঁধেছে হাঁটুতে, যেখানে থেমে ছিল তার ঠোঁট । কে বেছে দেবে চোরকাঁটা, কে করবে আদর, কে দেবে লেপে, ঠোঁটে শিশু মালতী—কে ডাকবে…চন্দ্রা আমার চন্দ্রাবতী বলে, আমার জাদু বলে?

মন্তব্য বন্ধ